ফুটবল দুনিয়ায় তাকে নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। কেউ তাকে দেখেন ‘অপ্রতিরোধ্য জাদুকর’ হিসেবে, কারো কাছে তিনি আবার ‘হতাশার প্রতিচ্ছবি’। কিন্তু দিনশেষে তার নামটা যখন নেইমার জুনিয়র, তখন ফুটবলপ্রেমীদের হৃদস্পন্দন এক মুহূর্তের জন্য হলেও থমকে দাঁড়াবে। আজ যখন আমরা ২০২৬ বিশ্বকাপের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে, তখন ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই; ৩৬ বছর পর পেলের উত্তরসূরি কি পারবেন ব্রাজিলকে সেই হেক্সা শিরোপা এনে দিতে?
নেইমারের শুরুটা হয়েছিল ২০১০ সালের দিকে। তখন তিনি সান্তোসের এক রোগা-পাতলা কিশোর, যার পায়ের জাদুতে মুগ্ধ ছিল পুরো ব্রাজিল। সে সময় অনেকেই মনে করতেন তিনি হয়তো কোনো ভিডিও গেমের কাল্পনিক চরিত্র। কারণ, বাস্তবের ফুটবল মাঠে অতটা নিখুঁত হওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। সেই চপলতা আর সৌন্দর্য নিয়ে তিনি পাড়ি জমান বার্সেলোনায়। মেসি এবং সুয়ারেজের সাথে মিলে গড়ে তোলেন ইতিহাসের অন্যতম ভয়ঙ্কর আক্রমণভাগ ‘এমএসএন’। ২০১৫ সালে বার্সার ট্রেবল জয়ের অন্যতম কারিগর ছিলেন এই ব্রাজিলিয়ান সুপারস্টার।
২০১৭ সালে রেকর্ড ২২২ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে পিএসজিতে যোগ দিয়ে নেইমার ফুটবল বিশ্বের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। কিন্তু প্যারিসের সেই অধ্যায় যতটা না সাফল্যের, তার চেয়ে বেশি ছিল ইনজুরি আর বিতর্কের। ক্লাবকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে তুললেও শেষ পর্যন্ত পরম আরাধ্য সেই ট্রফিটি ছোঁয়া হয়নি তার। ইনজুরি আর মাঠের বাইরের নানা আলোচনা তাকে বারবার থামিয়ে দিয়েছে।
সৌদি আরবের ক্লাব আল-হিলালে সময়টা মোটেও ভালো যায়নি নেইমারের। চোটের কারণে দীর্ঘ বিরতির পর তার চুক্তি বাতিল হলে ২০২৫ সালে তিনি ফিরে আসেন নিজের শৈশবের ক্লাব সান্তোসে। তখন ক্লাবটির অবস্থা ছিল শোচনীয়, দ্বিতীয় বিভাগ থেকে উঠে এসেই তারা আবার অবনমনের শঙ্কায় ছিল।
চিকিৎসকদের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ছেঁড়া মেনিসকাস নিয়েই নেইমার মাঠে নামলেন দলের প্রয়োজনে। শেষ পাঁচ ম্যাচে ৪ গোল আর এক অ্যাসিস্ট করে তিনি শুধু দলকেই রক্ষা করেননি, বরং প্রমাণ করেছেন তার ভেতরের সেই লড়াকু সত্তাটা এখনো ফুরিয়ে যায়নি।
ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়ে নেইমার এখন সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। তার ঝুলিতে অলিম্পিক স্বর্ণ আর কনফেডারেশন কাপ থাকলেও একটি বিশ্বকাপ বা কোপা আমেরিকার অভাব তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। ২০১৪-র সেই ইনজুরি, ২০১৮-তে কুর্তোয়ার অতিমানবীয় সেভ আর ২০২২-এ ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে সেই হৃদয়বিদারক পরাজয়; ভাগ্য বারবার মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে তার থেকে।
বর্তমানে কোচ কার্লো আনচেলত্তি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ফিট থাকলে ২০২৬ বিশ্বকাপের বিমানে নেইমারের থাকা প্রায় নিশ্চিত। ৩৪ বছর বয়সে পা রাখতে যাওয়া নেইমারের সামনে এটিই সম্ভবত শেষ সুযোগ।
নেইমার কি পারবেন তার ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়টি সোনালি রঙে রাঙাতে? সান্তোসকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তোলা সেই নেইমার কি পারবেন উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপে ব্রাজিলের দীর্ঘ দুই দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটাতে? উত্তরটা সময়ের হাতে, তবে ফুটবল বিশ্ব অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে নেইমারের সেই লাস্ট ড্যান্সের জন্য।
