বিশ্বকাপে গর্জন নাকি নীরব প্রস্থান?

নেইমার, একটি নাম, একটি অধ্যায়, একটা দীর্ঘশ্বাস। আধুনিক ফুটবলের আকাশে যিনি ঝলমলে নক্ষত্র হয়ে উঠেছিলেন, আজ তিনি যেন শীতের বিকেলে ঝরে পড়া পাতার মতোই নীরব, ক্লান্ত, অনিশ্চিত। প্রতিভা ছিল, চেষ্টা ছিল, জাদু ছিল। তবুও ভাগ্য যেন বারবার তার পথে দাঁড়িয়ে দিয়েছে কঠিন বাধা।

নেইমারের ক্যারিয়ারকে যদি গল্প বলা হয়, তবে তা অপূর্ণতায় ঠাসা। বারবার ইনজুরি, বারবার ফিরে আসার লড়াই, আর প্রতিবারই নতুন করে প্রশ্নচিহ্ন। এক সময় যিনি ছিলেন ব্রাজিল দলের অবধারিত কেন্দ্রবিন্দু, আজ তাকেই অপেক্ষা করতে হচ্ছে, তিনি আদৌ বিশ্বকাপ দলে থাকবেন কি না!

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপকে সামনে রেখে নেইমারের সামনে প্রশ্ন একটাই। তিনি কি আবারও হলুদ সবুজের জার্সিতে বিশ্বমঞ্চে নামতে পারবেন, নাকি এটাই হবে তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়।

সময়টা তার জন্য মোটেই সহজ নয়। দীর্ঘ ইনজুরির ইতিহাস বহুদিন ধরেই তাকে তাড়া করে ফিরছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে উরুগুয়ের বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাই ম্যাচে ছিঁড়ে যায় তার বাঁ পায়ের এসিএল। সেই আঘাতের পর আর কখনোই ব্রাজিলের জার্সিতে মাঠে নামা হয়নি। পুনর্বাসন, অনিশ্চয়তা আর মানসিক লড়াইয়ের মধ্যেই কেটে গেছে সময়। এর মধ্যেই ২০২৫ সালের ২২ ডিসেম্বর হাঁটুর মিডিয়াল মেনিসকাসে অস্ত্রোপচার করাতে হয় তাকে, যা তার প্রত্যাবর্তনের পথকে আরও জটিল করে তোলে।

তবুও, এই দীর্ঘ অন্ধকারের ভেতর একটাই আলো জ্বালিয়ে রেখেছেন নেইমার, বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্ন। ক্লাব ফুটবল, মোটা অঙ্কের চুক্তি কিংবা নতুন লিগের আকর্ষণ এখন আর তাকে তেমন টানে না। তার চোখে এখন শুধুই একটি ট্রফি। ব্রাজিলের হয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া। সেই স্বপ্ন পূরণ হলেই যেন তার ক্যারিয়ারের সব অপূর্ণতা পূর্ণতা পাবে।

এই লক্ষ্যেই প্রতিদিন চলছে কঠোর ট্রেনিং, ফিজিওথেরাপি আর নিরবচ্ছিন্ন রিহ্যাব। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সিদ্ধান্তটা এখন আর পুরোপুরি নেইমারের হাতে নেই। সবকিছু নির্ভর করছে ব্রাজিল জাতীয় দলের কোচ কার্লো আনচেলত্তির উপর। অভিজ্ঞ এই ইতালিয়ান কোচ স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন, নেইমার বিশ্বকাপে খেলবেন কেবল তখনই, যখন তিনি শতভাগ ফিট থাকবেন। আশি বা নব্বই শতাংশ ফিটনেসেও কোনো ছাড় নেই।

এই অবস্থান বাস্তবসম্মত হলেও নেইমারের জন্য তা বাড়তি চাপ তৈরি করছে। কারণ সময় খুব বেশি নেই। বিশ্বকাপ শুরু হতে আর মাত্র কয়েক মাস। তার ওপর টুর্নামেন্ট চলাকালীন নেইমারের বয়স হবে প্রায় ৩৪ বছর। দীর্ঘদিন প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলের বাইরে থাকা একজন খেলোয়াড়ের জন্য ফর্মে ফেরা সহজ নয়। তাই প্রশ্ন উঠছে, আনচেলত্তি কি অভিজ্ঞতার ওপর ভরসা করবেন, নাকি নতুন প্রজন্মের দিকে তাকাবেন।

এরই মধ্যে স্পোর্টস ইলাস্ট্রেটেডের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। বলা হয়েছে, যদি ২০২৬ বিশ্বকাপের স্কোয়াডে নিজের নাম না দেখেন, তাহলে অবসরের কথাও ভাবতে পারেন নেইমার। এই ভাবনাটা হতাশা থেকে নয়, বরং বাস্তবতা মেনে নেওয়ার জায়গা থেকেই আসছে। যদি ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় স্বপ্নটাই অধরা থেকে যায়, তবে মাঠ ছাড়ার সিদ্ধান্তই হয়তো তার কাছে সবচেয়ে সৎ পথ মনে হতে পারে।

ব্রাজিল ফুটবল জানে বিশ্বকাপের মানে কী। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এই দল ২০২৬ আসরে গ্রুপ সিতে পড়েছে মরক্কো, হাইতি আর স্কটল্যান্ডের সঙ্গে। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে তাদের অভিযান। সেই বিশাল মঞ্চে নেইমারকে দেখা যাবে কি না, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back To Top