ফুটবল বিশ্বে এমন খুব কম প্রতীক আছে, যা সময়ের সীমা পেরিয়ে একেবারে মিথে পরিণত হয়েছে। ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি ঠিক তেমনই এক প্রতীক। চার বছর পরপর কোটি কোটি মানুষের চোখ আটকে থাকে এই এক টুকরো সোনার দিকে। কে ছুঁবে, কে উঁচিয়ে ধরবে, কার হাতে উঠবে ফুটবলের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন; এই প্রশ্ন ঘিরেই আবর্তিত হয় বিশ্বকাপ।
বিশ্বকাপ ট্রফির ইতিহাস শুধু মাঠের জয়ের গল্প নয়। এর পেছনে আছে চুরি, যুদ্ধ, গোপন রাখা, হারিয়ে যাওয়া আর ফিরে পাওয়ার মতো রোমাঞ্চকর সব ঘটনা। কোনো কোনো অধ্যায় তো থ্রিলার সিনেমাকেও হার মানায়।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত দুটি আলাদা ট্রফি ব্যবহৃত হয়েছে। প্রথমটি ছিল ‘জুলে রিমে ট্রফি’। ১৯৩০ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত এটিই ছিল বিশ্বকাপের ট্রফি। নিয়ম ছিল, যে দেশ তিনবার বিশ্বকাপ জিতবে, তারা ট্রফিটি স্থায়ীভাবে নিজেদের করে নেবে। ১৯৭০ সালে পেলের নেতৃত্বে ব্রাজিল তৃতীয়বার শিরোপা জিতে সেই ট্রফি চিরতরে নিয়ে যায়। এরপর ১৯৭৪ সাল থেকে চালু হয় বর্তমানের ‘ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি’।
জুলে রিমে ট্রফির নকশা করেছিলেন ফরাসি ভাস্কর অ্যাবেল লাফ্ল্যুর। এতে ছিল গ্রিক বিজয়দেবী নাইকির সোনালি মূর্তি। মাথার ওপর অষ্টভুজাকৃতির একটি কাপ, গলায় বিজয়ের মালা। ট্রফিটি তৈরি হয়েছিল সোনালি প্রলেপ দেওয়া স্টার্লিং সিলভার দিয়ে। নিচে ছিল নীল রঙের ল্যাপিস লাজুলি পাথরের বেস। শুরুতে এর নাম ছিল ‘ভিক্টরি’। পরে ফিফার দীর্ঘদিনের সভাপতি জুলে রিমের সম্মানে ট্রফিটির নাম বদলে রাখা হয়।
এই ট্রফি নিয়ে সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনাগুলোর একটি ঘটে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। ১৯৩৮ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে তখন ট্রফিটি ছিল ইতালির কাছে। নাৎসি বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা করতে ফিফার সহসভাপতি অত্তোরিনো বারাসি ট্রফিটি ব্যাংকের ভল্ট থেকে বের করে নিজের শোবার ঘরে নিয়ে যান। পুরো যুদ্ধকাল জুড়ে সেটি লুকানো ছিল তাঁর বিছানার নিচে একটি জুতার বাক্সে।
১৯৫৮ বিশ্বকাপ আরেকটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত উপহার দেয়। ব্রাজিলের অধিনায়ক হিলদারালদো বেলিনি প্রথমবারের মতো ট্রফিটি মাথার ওপরে তুলে ধরেন। সেই ছবি এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে, আজও বিশ্বকাপ জয়ের উদ্যাপন মানেই ট্রফি মাথার ওপর তোলা।
১৯৬৬ সালে লন্ডনে ঘটে আরেক নাটকীয় ঘটনা। বিশ্বকাপ শুরুর চার মাস আগে একটি প্রদর্শনী থেকে জুলে রিমে ট্রফি চুরি হয়ে যায়। তদন্তে নামে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড, কিন্তু কোনো ফল মেলে না। ঠিক এক সপ্তাহ পর ডেভিড করবেট নামের এক ব্যক্তি তাঁর কুকুর পিকলসকে নিয়ে হাঁটতে বেরিয়ে ট্রফিটি খুঁজে পান। একটি গাড়ির নিচে সংবাদপত্রে মোড়ানো অবস্থায় ছিল সেটি। এই ঘটনায় পিকলস রাতারাতি জাতীয় নায়কে পরিণত হয়।
সবচেয়ে দুঃখজনক অধ্যায় আসে ১৯৮৩ সালে। ব্রাজিলে সংরক্ষিত আসল জুলে রিমে ট্রফি আবার চুরি হয়ে যায়। এবার আর সেটি ফিরে আসেনি। ধারণা করা হয়, চোরেরা ট্রফিটি গলিয়ে সোনার বার বানিয়ে ফেলেছিল। আজ ব্রাজিলের কাছে থাকা জুলে রিমে ট্রফিটি আসলে একটি প্রতিরূপ।
১৯৭৪ সাল থেকে ব্যবহৃত বর্তমান ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফির নকশা করেন ইতালির সিলভিও গাজানিগা। ১৮ ক্যারেট সোনায় তৈরি এই ট্রফিটি ভেতরে ফাঁপা। নইলে এর ওজন হতো প্রায় ৭০ কেজি, যা তোলা অসম্ভব।
এখন আর কোনো দল আসল ট্রফি স্থায়ীভাবে রাখতে পারে না। উদ্যাপন শেষ হলে ট্রফি ফিরে যায় ফিফার জুরিখ সদর দপ্তরে। বিশ্বজয়ী দল পায় সোনার প্রলেপ দেওয়া একটি রেপ্লিকা।
তবু বিশ্বকাপ ট্রফির আবেদন এতটুকুও কমেনি। এটি শত বছরের ফুটবল ইতিহাসের নীরব সাক্ষী, যেখানে জড়িয়ে আছে অগণিত স্বপ্ন, কান্না আর গৌরবের গল্প।
