মেসি ম্যাজিক কি হবে ছাব্বিশেও?

ফুটবলের আকাশে যখন আলো একটু নরম হয়ে আসে, গ্যালারির ভেতর তখনও একটি নাম ঝলমল করে জ্বলে; লিওনেল মেসি। বয়স বাড়ছে, ক্যালেন্ডারের পাতায় সংখ্যাও বদলাচ্ছে, কিন্তু বল পায়ে তার ছন্দ যেন সময়ের নিয়ম মানে না।

২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের সেই রাত এখনও অনেকের চোখে ভাসে। ট্রফি হাতে মেসির হাসি যেন ছিল এক যুগের অপেক্ষার অবসান। দীর্ঘ ক্যারিয়ারের সব অর্জনের পরও তখন মনে হয়েছিল, গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু মেসির গল্প কখনও সহজভাবে শেষ হয় না। বরং তিনি যেন প্রতিটি সমাপ্তিকে নতুন শুরুর দরজা বানিয়ে নেন।

ছোটবেলার সেই রোজারিওর ছেলেটি প্রথম বড় স্বপ্ন দেখেছিল ইউরোপের মাটিতে। স্পেনের ক্লাব বার্সেলোনা তাকে শুধু ফুটবলার বানায়নি, তৈরি করেছিল এক কিংবদন্তি। সতেরো বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি ক্লাবটিকে শিরোপার পর শিরোপা এনে দিয়েছেন। গোল, অ্যাসিস্ট, ড্রিবল, ট্রফি, রেকর্ড সব যেন তার জন্যই তৈরি ছিল।

পরে ফ্রান্সে নতুন অধ্যায়, তারপর যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি। বর্তমানে ইন্টার মায়ামি-র হয়ে খেললেও মাঠে নামলেই যেন দেখা যায় সেই পুরোনো মেসিকে। চোখে একই তীক্ষ্ণতা, পায়ে একই মায়াবী স্পর্শ।

তবে ক্লাবের সাফল্যের থেকেও বড় ছিল জাতীয় দলের স্বপ্ন। বহু বছর ধরে সমালোচনা, হতাশা আর অপেক্ষার ভার বইতে হয়েছে তাকে। অবশেষে ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয়ের মধ্য দিয়ে সেই অভিশাপ ভাঙে। তারপর আসে বিশ্বকাপ জয়। আকাশি-সাদা জার্সিতে আর্জেন্টিনা-কে বিশ্বসেরা করার সেই মুহূর্ত যেন তার জীবনের সবচেয়ে বড় কবিতা।

মাঠে মেসিকে দেখলে মনে হয়, ফুটবল তার কাছে শুধু খেলা নয়, এক ধরনের ভাষা। তিনি বল দিয়ে কথা বলেন। কখনও নিখুঁত পাসে, কখনও চোখধাঁধানো ড্রিবলে, কখনও গোলের জালে নিঃশব্দে বল জড়িয়ে। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা প্রায়ই বুঝতেই পারেন না, ঠিক কোন মুহূর্তে তিনি পাশ কাটিয়ে গেলেন।

বিশ্ব ফুটবলের পরিসংখ্যানেও তার নাম যেন আলাদা আলোয় লেখা। বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা, সর্বাধিক মিনিট মাঠে থাকা, সবচেয়ে বেশি গোলের সুযোগ তৈরি করা, নকআউট পর্বে সর্বাধিক অ্যাসিস্ট, এমন অসংখ্য রেকর্ড তার দখলে। অনেক কিংবদন্তি খেলোয়াড়ই স্বীকার করেছেন, মেসিকে বোঝা সহজ নয়। কেউ বলেন তিনি অন্য গ্রহের, কেউ বলেন তিনি ফুটবলের সংজ্ঞা বদলে দিয়েছেন।

এখন সামনে নতুন লক্ষ্য। ২০২৬ সালে আবার বিশ্বমঞ্চে নামবে ফুটবলের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬। বয়স তখন প্রায় চল্লিশ ছুঁইছুঁই হলেও মেসিকে ঘিরে স্বপ্ন দেখছে পুরো আর্জেন্টিনা।

দলের তরুণ তারকারা প্রস্তুত, কোচের কৌশল তৈরি, ভক্তদের প্রত্যাশা তুঙ্গে। কিন্তু সব আলো গিয়ে পড়ে এক মানুষেই। কারণ মাঠে তার উপস্থিতি মানেই আত্মবিশ্বাস, মানেই বিশ্বাস যে অসম্ভব বলে কিছু নেই।

হয়তো এটিই তার শেষ বিশ্বকাপ হতে পারে। হয়তো আবারও তিনি ট্রফি ছুঁয়ে দেখবেন। কিন্তু ফলাফল যাই হোক, একটি সত্য ইতিমধ্যেই নিশ্চিত হয়ে গেছে।

মেসি শুধু একজন ফুটবলার নন। তিনি এক দীর্ঘ গল্প, যেখানে প্রতিটি অধ্যায়ে লেখা থাকে জাদু, সংগ্রাম আর অবিশ্বাস্য সাফল্যের কাহিনি। আর সেই গল্প এখনও শেষ হয়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back To Top