বিশ্বকাপে সেলেসাওদের গৌরবগাঁথা

বিশ্বফুটবলের চিরন্তন মহাসত্যের নাম ‘সেলেসাও’। অথচ চব্বিশটি বছর কেটে ধরে সোনালি ট্রফিটার গায়ে সেই সেলেসাওদের ছোঁয়া লাগেনি। ২০০২ সালের পর কেবলই অপেক্ষা, আর প্রতিভার ঝলক দেখিয়েও কোয়ার্টার ফাইনালের মঞ্চে বারবার হৃদয় ভাঙার গল্প।

কাতার ২০২২-এর সেই নিঝুম রাতে ক্রোয়েশিয়ার কাছে টাইব্রেকারে হেরে যখন নেইমার-অ্যান্টনিরা মাঠেই কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন, তখন আরও একবার থমকে গিয়েছিল পুরো ফুটবল দুনিয়া। কিন্তু সাম্বা ফুটবল তো কেবল হারতে শেখেনি, সে জানে কীভাবে ছাই ভস্ম থেকে ফিনিক্স পাখির মতো ডানা মেলতে হয়।

ফুটবল ইতিহাসের একমাত্র দল হিসেবে প্রতিটি বিশ্বকাপের মঞ্চ আলো করা ব্রাজিলের জন্য আসনন্ন ২০২৬ সালের মহাযজ্ঞটি কেবল আরেকটি টুর্নামেন্ট নয়; এটি এক শতাব্দী প্রাচীন ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির রোমাঞ্চকর হাতছানি। লাতিন আমেরিকার তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বাছাইপর্বের চড়াই-উতরাই পেরিয়ে, পঞ্চম স্থানে থেকে যখন তারা উত্তর আমেরিকার টিকিট নিশ্চিত করল, তখনই যেন লেখা হয়ে গিয়েছিল এক অদ্ভুত সমীকরণ।

ইতিহাস সাক্ষী, ১৯৭০ সালের মেক্সিকো জয়ের পর দীর্ঘ ২৪ বছরের যে খরা তৈরি হয়েছিল, ১৯৯৪ সালে আমেরিকার মাটিতেই ইতালির বিপক্ষে সেই বিখ্যাত পেনাল্টি শুট-আউটে রবার্তো বাজ্জিওর শট আকাশে মিলিয়ে যেতেই অবসান ঘটেছিল সেই যন্ত্রণার। কাকতালীয়ভাবে, ২০০২ সালের পর আবার যখন ঠিক ২৪ বছর পূর্ণ হতে চলেছে, ঠিক তখনই বিশ্বকাপ ফিরছে সেই উত্তর আমেরিকার চেনা আঙিনায়। এবার তিন দেশ কানাডা, মেক্সিকো এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ মঞ্চে হেক্সা বা ষষ্ঠ শিরোপা পুনরুদ্ধারের মিশন ব্রাজিলের।

তবে এবারের গল্পে রয়েছে এক দারুণ চমক, এক ঐতিহাসিক মোড়। যে ইতালিকে হারিয়ে ব্রাজিলিয়ানরা একসময় উল্লাসে মেতেছিল, সেই ইতালিরই এক কিংবদন্তি ‘ডন’ এবার বসেছেন সেলেসাওদের ডাগআউটে। রিয়াল মাদ্রিদের সোনালি অধ্যায় চুকিয়ে আসা কার্লো আনচেলত্তি প্রথম বিদেশি কোচ হিসেবে বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্ব দিতে যাচ্ছেন সেলেসাও বাহিনীকে। ১৯৯৪ সালের সেই ফাইনালে যিনি ছিলেন ইতালির সহকারী কোচ, আজ তিনিই ব্রাজিলের কোটি ভক্তের স্বপ্নসারথি। আনচেলত্তির চাণক্য মস্তিস্ক আর ব্রাজিলের তরুণ তুর্কিদের পায়ে বলের জাদুকরী ছন্দ; এই দুইয়ের মেলবন্ধনে মরক্কো, হাইতি আর স্কটল্যান্ডের মুখোমুখি হতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত হলুদ শিবির।

ব্রাজিলের ফুটবল মানেই তো এক একটা রূপকথা। যেখানে ১৯৩০ সালে যুগোস্লাভিয়ার বিরুদ্ধে প্রেগুইনহোর সেই প্রথম ঐতিহাসিক গোল থেকে শুরু করে ১৯৫৮ ও ১৯৭০ সালে ‘ও রেই’ বা ফুটবল সম্রাট পেলের রাজকীয় মুকুট জয়, কিংবা ১৯৬২ সালে পেলের চোটের পর গারিঞ্চার একক নৈপুণ্যে বিশ্বকে স্তব্ধ করে দেওয়ার গল্প জড়িয়ে আছে। জড়িয়ে আছে ২০০২ সালে জার্মানির জাল কাঁপানো ‘দ্য ফেনোমেনন’ রোনালদো নাজারিওর সেই ১৫ গোলের মহাকীর্তি কিংবা কাফুর ২০টি ম্যাচ খেলে অনন্য রেকর্ড গড়ার উপাখ্যান। আবার এই ইতিহাসেই মিশে আছে ১৯৫০ সালের মারাকানার সেই স্তব্ধতা, যেখানে ৭-১ গোলে সুইডেনকে উড়িয়ে দেওয়ার আনন্দের পরেই উরুগুয়ের কাছে হেরে বিষাদে ডুবেছিল পুরো দেশ। জয় আর পরাজয়ের এই দোলাচলেই তো পূর্ণতা পেয়েছে ব্রাজিলের ফুটবল সংস্কৃতি। ২০২৬ সালের জুনে যখন নিউইয়র্ক কিংবা মিয়ামির সবুজ গালিচায় বল গড়াবে, তখন দুই মহাদেশ জুড়ে কোটি কোটি হৃদয়ের স্পন্দন আবার এক হয়ে যাবে কেবল একটিই আশায়; এবার কি তবে চব্বিশ বছরের খরা কাটিয়ে উত্তর আমেরিকার আকাশেই ডানা মেলবে ষষ্ঠ কানারিনহো?

বিডি প্রতিদিন/এনএইচ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back To Top