ফুটবল দুনিয়ার চিরন্তন বৈরিতা আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলের। মাঠের সেই যুদ্ধ কখনো কখনো রূপ নেয় এক চরম মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে। কিন্তু সেই চিরশত্রুতার দেওয়াল ভেঙে যখন ভালোবাসার এক পশলা হাওয়া বয়ে যায়, তখন থমকে দাঁড়ায় গোটা বিশ্ব। ঠিক তেমনই এক আবেগঘন ও নাটকীয় অধ্যায়ের জন্ম দিলেন ফুটবলের জাদুকর লিওনেল মেসি। শত্রুতার সব সমীকরণকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মেসি সাফ জানিয়ে দিলেন, ব্রাজিলের জার্সিতে আরও একটা বিশ্বকাপ পাওয়ার অধিকার রয়েছে নেইমারের।
বার্সেলোনার সেই সোনালি দিনগুলো থেকে শুরু করে পিএসজির চড়াই-উতরাই; মাঠের ভেতরে তাঁদের রসায়ন যতটা চোখ ধাঁধানো ছিল, মাঠের বাইরে তাঁদের বন্ধুত্ব তার চেয়েও গভীর। তাই তো চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের সবচেয়ে বড় তারকার দুঃসময়ে মেসি আর চুপ থাকতে পারলেন না।
চোট আর ফর্মের টানাপোড়েনে যখন ব্রাজিলের সেলেসাও শিবিরে নেইমারের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক বড় প্রশ্নচিহ্ন ঝুলে আছে, ঠিক তখনই ত্রাতা হয়ে এলেন ফুটবলের এই রাজপুত্র। পোল্লো আলভারেজের ‘লো দেল পোল্লো’ শো-তে হাজির হয়ে মেসি অকপটে স্বীকার করলেন, বন্ধু নেইমারের ব্যাপারে তিনি কোনোভাবেই নিরপেক্ষ হতে পারেন না। আবেগতাড়িত কণ্ঠে মেসি বলেন, ফুটবল বিশ্ব সবসময় সেরা খেলোয়াড়দের বিশ্বমঞ্চে দেখতে চায়, আর নেইমার কেমন ফর্মে আছেন সেটা কোনো বিষয়ই নয়, তিনি সবসময়ই বিশ্বসেরাদের একজন।
মেসির এই সুর যেন ফুটবল রোমান্টিকদের হৃদয়ে এক অদ্ভুত আলোড়ন তৈরি করেছে। ল্যাটিন আমেরিকার ফুটবলে যখন ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা মানেই বারুদ আর স্লেজিং, তখন মেসির মুখে নেইমারের প্রশংসা এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। নিজের মনের গভীর থেকে মেসি আশা প্রকাশ করেন, নেইমার যেন আসন্ন বিশ্বকাপে ব্রাজিলের হলুদ জার্সিতে মাঠ কাঁপাতে পারেন। কারণ একজন মানুষ হিসেবে নেইমার কতটা খাঁটি, তা মেসির চেয়ে ভালো আর কে জানে! মেসির মতে, কৃত্রিমতার এই আধুনিক ফুটবলে নেইমার এক অনন্য চরিত্র, যিনি কোনো রকম অভিনয় করেন না, নিজের খেয়ালখুশিতে বাঁচেন এবং ভীষণ রকমের সহজাত।
সৌদি আরবের আল-হিলালে গিয়ে মারাত্মক চোটের কবলে পড়ে দীর্ঘদিন মাঠের বাইরে কাটাতে হয়েছে নেইমারকে। এরপর পুরনো ঠিকানা সান্তোসে ফিরে এসে নিজের হারিয়ে যাওয়া ফর্ম হাতড়ে বেড়াচ্ছেন এই ব্রাজিলিয়ান জাদুকর। ব্রাজিলের হয়ে শেষ কবে মাঠে নেমেছিলেন, তাও হয়তো অনেকে ভুলে যেতে বসেছেন।
ঠিক এই কঠিন মুহূর্তে মেসির এই প্রকাশ্য সমর্থন যেন নেইমারের বুকে এক নতুন আশার আলো জ্বেলে দিল। মাঠের বৈরিতা ভুলে এক পরম বন্ধুর জন্য মেসির এই আকুলতা প্রমাণ করে দিল, ট্রফি আর রেকর্ডের চেয়েও ফুটবলে বন্ধুত্বের টান কতখানি দামি হতে পারে। এখন দেখার বিষয়, মেসির এই আবেগঘন আকুতি ব্রাজিলের নির্বাচকদের মন গলাতে পারে কি না, আর ফুটবল বিশ্ব আরও একবার বিশ্বমঞ্চে নেইমারের পায়ে সেই চেনা সাম্বার জাদু দেখতে পায় কি না।
