মাঠে তখন টানটান উত্তেজনা, গ্যালারিতে লাখো ভক্তের হৃদস্পন্দন যেন থমকে গেছে। কাতার ২০২২-এর সেই ঐতিহাসিক রাতে ফ্রান্সের বিপক্ষে পেনাল্টি শুট-আউটের সেই স্নায়ুযুদ্ধ কেবল একটি ম্যাচ ছিল না, তা ছিল এক মহাকাব্যিক লড়াই। ফরাসিদের রুখে দিয়ে যখন লিওনেল মেসির হাতে উঠলো সোনালি ট্রফি, তখন বিশ্ববাসী দেখল দোহা জয় করে আর্জেন্টিনার আকাশে জ্বলজ্বল করছে তৃতীয় তারকা। কিন্তু সেই সোনালি অতীতকে পেছনে ফেলে এবার মিশন উত্তর আমেরিকা। ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপে কানাডা, মেক্সিকো আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবুজ গালিচায় নিজেদের টানা দ্বিতীয় শিরোপা ধরে রাখার এক চরম অগ্নিপরীক্ষায় নামছে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। কোচ লিওনেল স্কালোনির অধীনে এক অপরাজেয় শক্তিতে রূপ নেওয়া আলবিসেলেস্তেরা ইতিমধ্যেই দক্ষিণ আমেরিকান কোয়ালিফায়ারে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে এবং রানার্স-আপ ইকুয়েডরের চেয়ে স্পষ্ট ৯ পয়েন্টে এগিয়ে থেকে সবার ওপরে শেষ করে বিশ্বকাপের টিকিট কেটেছে।
অথচ এই সোনালি দিনের পথচলাটা মোটেও মসৃণ ছিল না। ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে ফ্রান্সের কাছে বিধ্বস্ত হয়ে বিদায় নেওয়ার পর হোর্হে সাম্পাওলির বিদায়ে এক চরম অস্থিরতা গ্রাস করেছিল আর্জেন্টাইন ফুটবলকে। ঠিক তখনই ত্রাতা হিসেবে ডাগআউটের দায়িত্ব নেন তখনকার অন্তর্বর্তীকালীন কোচ লিওনেল স্কালোনি। ইয়াং ব্লাড , বল পজিশনভিত্তিক আক্রমণাত্মক রণকৌশল আর হার না মানা মানসিকতা দিয়ে তিনি বদলে দেন দৃশ্যপট। ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা জয় দিয়ে ঘুচে যায় দীর্ঘ তিন দশকের শিরোপার খরা, যা পরবর্তীতে কাতার বিশ্বকাপ ও ২০২৪-এর ব্যাক-টু-ব্যাক কোপা জয়ের এক দুর্ভেদ্য ভিত গড়ে দেয়।
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনাল হারের ক্ষত দিয়ে শুরু হওয়া এই যাত্রায় ১৯৭৮ সালে ঘরের মাঠে মারিও কেম্পেসের ম্যাজিকে প্রথমবার বিশ্বজয়ের স্বাদ পায় আর্জেন্টিনা। এর ঠিক আট বছর পর, ১৯৮৬ সালে মেক্সিকোর মাটিতে ফুটবল ঈশ্বর দিয়াহগো ম্যারাডোনা যেন একাই টেনে নিয়ে যান পুরো দলকে এবং বিশ্ববাসীকে উপহার দেন এক অলৌকিক বিশ্বকাপ। এর পর দীর্ঘ ৩৬ বছরের অপেক্ষা, ২০১৪ সালে ব্রাজিলের মারাকানায় জার্মানির কাছে ফাইনাল হারের সেই বুকভাঙ্গা কান্না, অবশেষে ২০২২ সালে এসে সেই যন্ত্রণার অবসান ঘটান রোজারিও থেকে আসা এক ক্ষুদে জাদুকর লিওনেল মেসি। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ২৬টি ম্যাচ খেলা এবং দেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি ১৩টি গোল করা এই কিংবদন্তি এখন নিজের শেষ বেলায় এসে আরেকটি রূপকথার জন্ম দিতে উন্মুখ।
আগামী ১৬ জুন কানসাস সিটিতে আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু হচ্ছে আর্জেন্টিনার শিরোপা রক্ষার মিশন, যেখানে গ্রুপ পর্বে তাদের পরবর্তী প্রতিপক্ষ অস্ট্রিয়া ও জর্ডান। ১৯৫৮ এবং ১৯৬২ সালে ব্রাজিলের পর দীর্ঘ ছয় দশকে আর কোনো দেশ যা পারেনি; টানা দুইবার বিশ্বকাপ জয়; সেই অবিশ্বাস্য রেকর্ড ছুঁতেই এবার উত্তর আমেরিকার মাঠে পা রাখছে স্কালোনির শিষ্যরা।
সূত্র: ফিফা
