বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা জাদুকর নেইমার জুনিয়র। যার পায়ের জাদুতে বুঁদ হয়ে থাকে গোটা দুনিয়া, সেই ব্রাজিলিয়ান মহাতারকার ক্যারিয়ারে বিশ্বকাপের মঞ্চ মানেই যেন এক চরম ট্র্যাজেডি আর বুকভাঙ্গা কান্নার গল্প। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডার যৌথ আয়োজনে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে নেইমারের চতুর্থ এবং সম্ভবত শেষ বিশ্বমঞ্চ। যেখানে তার সামনে অপেক্ষা করছে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রতিশোধ আর রাজকীয় প্রত্যাবর্তনের সুযোগ।
নেইমারের এই বিশ্বকাপ ট্র্যাজেডির শুরুটা হয়েছিল ২০১০ সালে, যখন মাত্র ১৮ বছর বয়সেই সান্তোসের হয়ে আলো ছড়াচ্ছিলেন তিনি। ফুটবল সম্রাট পেলের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে তাকে দলে নেওয়ার জন্য ব্রাজিলের আপামর জনতা দাবি তুললেও তৎকালীন কোচ দুঙ্গা সবাইকে চমকে দিয়ে নেইমারকে স্কোয়াড থেকেই বাদ দিয়ে দেন। এরপর ২০১৪ সালে ঘরের মাঠের বিশ্বকাপে যখন নেইমার পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে দুর্দান্ত খেলছিলেন, ঠিক তখনই কলম্বিয়ার বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে হুয়ান জুনিগার এক নির্মম ট্যাকলে তার পিঠের মেরুদণ্ডের হাড়ে চির ধরে। নেইমার পরবর্তীতে কেঁদে বলেছিলেন যে, সে যাত্রায় আর মাত্র কয়েক সেন্টিমিটারের জন্য তিনি পঙ্গু হওয়া থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন। তার অনুপস্থিতিতেই জার্মানির কাছে ঘরের মাঠে ৭-১ গোলের সেই ঐতিহাসিক লজ্জায় ডুবেছিল সেলেসাওরা।
২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে নেইমার মাঠে আসেন বিশ্বের সবচেয়ে দামি খেলোয়াড় হিসেবে। সেখানে প্রথম ম্যাচেই সুইজারল্যান্ডের ডিফেন্ডাররা তাকে দফায় দফায় ফাউল করে রক্তাক্ত করার চেষ্টা করে। যদিও সেবার দুর্দান্ত কিছু গোল করেছিলেন নেইমার। কিন্তু মাঠের ফাউলের পর তার অতিরিক্ত গড়াগড়ি করার নাটকীয়তা তাকে প্রশংসার চেয়ে বিশ্বজুড়ে ট্রল আর মিমের পাত্র বানিয়ে তোলে।
শেষ পর্যন্ত বেলজিয়ামের কাছে হেরে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই বিদায় নিতে হয় ব্রাজিলকে। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপেও নেইমারের এই অভিশাপ কাটেনি। প্রথম ম্যাচেই সার্বিয়ার ডিফেন্ডারদের কড়া ট্যাকলে গোড়ালির চোটে পড়ে গ্রুপ পর্ব থেকেই ছিটকে যান তিনি। নকআউট পর্বে ইনজুরি কাটিয়ে ফিরে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে এক জাদুকরী গোল করে ব্রাজিলকে সেমিফাইনালের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় গোল হজম করে ম্যাচ টাইব্রেকারে গড়ালে, নেইমার পেনাল্টি নেওয়ার সুযোগ পাওয়ার আগেই বিদায় নেয় ব্রাজিল। ম্যাচের পর মাঠে বসে তার অঝোরে কাঁদার দৃশ্য কোটি ফুটবল ভক্তের হৃদয় ভেঙে দেয়।
সব হারিয়েও ফুরিয়ে যাননি এই কিংবদন্তি। ইনজুরি আর ফর্ম নিয়ে হাজারো সমালোচনা পেছনে ফেলে, অভিজ্ঞতার প্রতি ভরসা রেখে ২০২৬ বিশ্বকাপের স্কোয়াডে নেইমারকে ডেকে নিয়েছেন কোচ কার্লো আনচেলত্তি। ক্যারিয়ারের সব দুঃখ আর অপূর্ণতা ঘুচিয়ে ১৯৭০ সালের পেলে কিংবা ১৯৯৪ সালের রোমারিওর মতো ব্রাজিলকে বিশ্বজয়ের মুকুট এনে দেওয়ার এটাই হয়তো নেইমারের শেষ সুযোগ। উত্তর আমেরিকার এই বিশ্বকাপ নেইমারের জন্য কেবল আরেকটি টুর্নামেন্ট নয়, এটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ট্র্যাজেডিকে রূপকথার গল্পে রূপ দেওয়ার শেষ মঞ্চ।
