বিশ্বকাপের বলটাই যেন এক বিস্ময়

দিনলিপির পাতা পেরিয়ে ঘনিয়ে আসছে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। গ্রেট ব্রিটেনের কবি টেনিসন লিখেছিলেন, The old order changeth, yielding place to new। আর এবার সেই নতুনের আবাহন ঘটছে ফুটবলের সবুজ গালিচায়। উত্তর আমেরিকার তিন বিশাল সাম্রাজ্য—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা আর মেক্সিকোর বুকে আর মাত্র কয়েক দিন পর বসছে বিশ্ব ফুটবলের মহাযজ্ঞ।

কিন্তু এবারের মহাযজ্ঞ কেবল পায়ের জাদুতেই সীমাবদ্ধ নয়, বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধনে তা রূপ নিচ্ছে এক মহাকাব্যে। ফুটবলপ্রেমী দর্শক, মাঠের সেই চেনা চামড়ার গোলকটি এবার আর কেবলই জড়বস্তু নয়; সে এবার জীবন্ত, সে এবার কথা বলবে!

নাম তার ‘ট্রাইওন্ডা’। স্প্যানিশ ঘরানায় যার অর্থ ‘তিন ঢেউ’। তিন স্বাগতিক দেশের মেলবন্ধনে তৈরি এই গোলক নিজের বুকে ধারণ করেছে কানাডার ম্যাপল পাতা, মেক্সিকোর গর্বিত ইগল আর যুক্তরাষ্ট্রের নীল নক্ষত্র। আর সোনালি রঙের তুলির টানে যেন সে কুর্নিশ জানাচ্ছে পরম আরাধ্য সেই ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফিকে।

কিন্তু রূপের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক পরম বিস্ময়! এই বলের হৃদপিণ্ডে স্পন্দিত হচ্ছে আধুনিক বিজ্ঞানের এক জাদুকরী চিপ। ৫০০ হার্টজ গতির এক সংবেদনশীল সেন্সর চিপ, যা প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ বার তথ্য পাঠাবে মহাকাশীয় গতিতে।

ভাবুন একবার! ফুটবলারের পায়ে বলের মৃদু ছোঁয়া, বাতাসে তার ঘূর্ণন, কিংবা গোলপোস্ট লক্ষ্য করে ছিটকে যাওয়া বুলেটের গতি—সবকিছুই মাপা হবে নিখুঁত পাল্লায়। মাত্র ১৪ গ্রাম ওজনের এই চিপটি যেন এক অদৃশ্য রেফারি, যা খেলাটির সৌন্দর্যকে এতটুকুও ক্ষুণ্ন না করে শাসন করবে মাঠের প্রতিটি মুহূর্ত।

তবে শুনুন, এই আধুনিক জাদুরও একটি মানবিক সীমাবদ্ধতা আছে। ঠিক যেন রক্ত-মাংসের মানুষের মতোই, দীর্ঘ লড়াইয়ের পর তারও প্রয়োজন পড়ে বিশ্রামের, প্রয়োজন পড়ে শক্তির পুনরুজ্জীবনের। হ্যাঁ, এই বলটিকে নিয়মিত দিতে হবে ‘চার্জ’! ম্যাচের আগে তাকে বৈদ্যুতিক শক্তিতে পুষ্ট করতে হবে। পূর্ণ চার্জে সে সচল থাকবে মাত্র ৬টি ঘণ্টা।

মাঠের উচ্চগতির ক্যামেরার সঙ্গে মিতালি করে এই ‘ট্রাইওন্ডা’ তৈরি করবে ত্রিমাত্রিক এক মায়াজাল। সেকেন্ডে ৫০ বার শনাক্ত করবে বল ও খেলোয়াড়ের অবস্থান। ফলে, অফসাইডের চুলচেরা বিশ্লেষণ কিংবা বলের স্পর্শ নিয়ে তৈরি হওয়া চিরন্তন বিতর্কগুলো এবার মুহূর্তেই মিলিয়ে যাবে কর্পূরের মতো। ভিএআর বা ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির চোখে এই বল এনে দেবে এক মহাজাগতিক স্পষ্টতা।

বিজ্ঞান কি তবে ফুটবলের সেই আদিম ও অকৃত্রিম রোমাঞ্চকে কেড়ে নিচ্ছে? নাকি বিতর্কহীন এক নিখুঁত সৌন্দর্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এই সুন্দর খেলাটিকে? উত্তর দেবে সময়। তবে এটুকু নিশ্চিত, এবারের বিশ্বকাপে মাঠ কাঁপাবে কেবল ফুটবলারদের পা নয়, বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির এক অদ্ভুত মেলবন্ধন। ‘ট্রাইওন্ডা’র হাত ধরে ফুটবল পা রাখল এক নতুন শতাব্দীতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back To Top