মাঠের লড়াই শুরু হওয়ার আগেই যখন খাতা-কলমে কাউকে বিশ্বসেরা ঘোষণা করে দেওয়া হয়, তখন সেই দলের কাঁধে চেপে বসে এক অদৃশ্য পাহাড়সম চাপ। ২০২৬ সালের ফুটবল মহাযজ্ঞের ঠিক আগে স্পেনের মাথায় যখন ফেভারিটের তকমা লেগেছে, তখন ইতিহাসের পাতা উল্টে ফুটবলভক্তদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়াই স্বাভাবিক। কারণ পরিসংখ্যান বলছে, বুট আর বলের লড়াইয়ে জ্যোতিষী কিংবা বাজিকরদের ভবিষ্যদ্বাণী খুব কম সময়ই বাস্তবে রূপ পেয়েছে।
সবুজ গালিচার এই মহাকাব্যে প্রথম অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল ১৯৩০ সালে, যখন লাতিন আমেরিকার দুই পরাশক্তি আর্জেন্টিনা আর উরুগুয়েকে রাখা হয়েছিল শ্রেষ্ঠত্বের কাতারে। যদিও শেষ পর্যন্ত ঘরের মাঠে উরুগুয়েই প্রথম চুমু খেয়েছিল সোনালী ট্রফিতে, কিন্তু পরের আসরগুলোতেই শুরু হয় ফেভারিটদের পথ হারানো দীর্ঘ হাহাকারের গল্প। ১৯৩৪ সালে অস্ট্রিয়ার সেই কালজয়ী ‘ওয়ান্ডার টিম’ যখন পুরো বিশ্বকে শাসন করছিল, তখন সেমিফাইনালে ইতালির কাছে হেরে তাদের স্বপ্ন চুরমার হয়ে যায়।
মারাকানা ট্র্যাজেডির কথা ভাবলে আজও ব্রাজিলের মানুষের বুক কেঁপে ওঠে, যেখানে ১৯৫০ সালে প্রায় নিশ্চিত চ্যাম্পিয়ন হিসেবে মাঠে নেমেছিল সেলেসাওরা। পুরো টুর্নামেন্টে প্রতিপক্ষকে গোলবন্যায় ভাসিয়ে দিয়েও উরুগুয়ের বিপক্ষে সেই ঐতিহাসিক ফাইনালে ২-১ গোলের হারে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল গোটা ব্রাজিল। ঠিক একইভাবে ১৯৫৪ সালে হাঙ্গেরির সেই ‘ম্যাজিক্যাল ম্যাজিয়ার্স’ দলটি টুর্নামেন্টের শুরুতেই পশ্চিম জার্মানিকে ৮-৩ গোলে বিধ্বস্ত করেও ফাইনালে গিয়ে তাদের কাছেই নাটকীয়ভাবে হেরে যায়।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে ফেভারিট হওয়ার অভিশাপ থেকে খুব কম দলই নিজেদের মুক্ত করতে পেরেছে, যার উজ্জ্বল ব্যতিক্রম ছিল ১৯৬২ সালের ব্রাজিল। কিংবদন্তি পেলের ইনজুরির পরও গারিঞ্চার জাদুতে তারা টানা দ্বিতীয়বার শিরোপা ঘরে তুলেছিল, যা ছিল বাজিকরদের জন্য এক বিশাল স্বস্তির খবর। তবে ১৯৬৬ সালে সেই ব্রাজিলই আবার যখন ফেভারিট হয়ে ইংল্যান্ডে গেল, তখন গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়ে ফুটবল বিশ্বকে হতবাক করে দিয়েছিল তারা।
৭০-এর দশকে টোটাল ফুটবলের জনক ইয়োহান ক্রুইফ আর তার নেদারল্যান্ডস দল যখন পুরো বিশ্বকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিল, তখন তারা ছিল সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে ফেভারিট। কিন্তু ১৯৭৪ সালের ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির লড়াকু মানসিকতার কাছে হার মেনে টোটাল ফুটবলকে চোখের জলেই মাঠ ছাড়তে হয়েছিল। ১৯৮২ সালেও সেই একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটেছিল, যখন জিকো-সক্রেটিসদের নান্দনিক ব্রাজিলকে বিদায় করে দিয়ে শিরোপা ছিনিয়ে নিয়েছিল ইতালির সেই বিধ্বংসী দলটি।
নব্বইয়ের দশকে ইতালির মাটিতে স্বাগতিকরাই ছিল সবচেয়ে বড় দাবিদার, কিন্তু ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনার কাছে সেমিফাইনালে হার তাদের কাঁদিয়েছিল। আবার ১৯৯৮ সালে রোনালদো নাজারিওর ব্রাজিলকে যখন কেউ হারাতে পারবে না বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল, ঠিক ফাইনালের আগে রোনালদোর রহস্যময় অসুস্থতা পুরো সমীকরণ বদলে দেয়। জিদানের ফ্রান্স সেই সুযোগে নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ জিতে উৎসবের রঙ ছড়িয়েছিল প্যারিসের রাজপথে।
আধুনিক ফুটবলের যুগে ২০০২ সালের আসরে ফেভারিট হিসেবে আসা আর্জেন্টিনা আর ফ্রান্স যখন গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিল, তখন ফুটবল বিশ্ব যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল। ফেভারিট তকমা নিয়ে আসা দলগুলো বারবারই দেখেছে যে, মাঠের ৯০ মিনিটের লড়াইয়ে পূর্ব অভিজ্ঞতার চেয়ে বেশি মূল্যবান হয়ে ওঠে মুহূর্তের কৌশল আর স্নায়ুচাপ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা। ২০১০ সালে স্পেন যদিও ফেভারিট হিসেবে শুরু করে শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হয়েছিল, কিন্তু ২০১৪ আর ২০১৮ সালে জার্মানি ও ব্রাজিলের ব্যর্থতা প্রমাণ করে দিয়েছে যে ভাগ্যের চাকা কখন কোন দিকে ঘোরে তা কেউ জানে না।
সবশেষ কাতার বিশ্বকাপে ব্রাজিলকে যখন হেক্সা জয়ের পথে সবচেয়ে বড় শক্তি ভাবা হচ্ছিল, তখন ক্রোয়েশিয়ার পেনাল্টি শুটআউট তাদের স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে দেয়। মেসি আর আর্জেন্টিনার শিরোপা জয় ছিল অনেক চড়াই-উতরাইয়ের গল্প, যা শুরু হয়েছিল সৌদি আরবের কাছে হারের ধাক্কা দিয়ে। ফুটবলের এই অনিশ্চয়তার সৌন্দর্যই হলো ফেভারিটদের পতন আর আন্ডারডগদের বীরত্বগাথা, যা প্রতি চার বছর অন্তর আমাদের নতুন কোনো রূপকথা শোনায়।
ফেভারিট হওয়া মানেই যেন এক অভিশপ্ত বোঝা বয়ে বেড়ানো, যা অনেক সময় খেলোয়াড়দের পায়ের স্বাভাবিক ছন্দ কেড়ে নেয়। বড় বড় সব তারকার মেলা আর বর্ণাঢ্য সব রেকর্ড যখন ব্যর্থতার বালুচরে হারিয়ে যায়, তখন ফুটবল ভক্তরা উপলব্ধি করেন যে এই খেলা কেবল পরিসংখ্যানের নয়, বরং হৃদপিণ্ডের স্পন্দন আর লড়াকু মানসিকতার। স্পেনের জন্য ২০২৬ সালের এই ফেভারিট তকমা তাই আশীর্বাদ নাকি বুকচেরা আর্তনাদ হবে, তার উত্তর দেবে কেবল সময়।
ফুটবল বিধাতা হয়তো এভাবেই তার চিত্রনাট্য সাজান, যেখানে ফেভারিটদের কান্নায় সিক্ত হয় মাঠ আর বিজয়ীর বেশে নতুন কোনো বীরের অভিষেক ঘটে। বুট আর বলের এই রোমাঞ্চকর পথচলায় ইতিহাস সাক্ষী দিচ্ছে, ফেভারিট হওয়া মানেই শিরোপা নয়, বরং পাহাড়সম প্রত্যাশার নিচে পিষ্ট হওয়ার আশঙ্কা। আগামী বিশ্বকাপে স্পেনের লাল জার্সিধারীরা কি পারবেন ইতিহাসের এই দেয়াল ভাঙতে, নাকি আবারও কোনো নতুন রূপকথার জন্ম দেবে অন্য কোনো দেশ; তা দেখার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে পুরো বিশ্ব।
সূত্র: ফিফা
