বিশ্বকাপে অঘটন, অঘটনের বিশ্বকাপ

ফুটবল বিশ্বকাপের চেয়ে রোমাঞ্চকর এবং অনিশ্চয়তায় ঘেরা মঞ্চ ক্রীড়াবিশ্বে আর দ্বিতীয়টি নেই। মাঠের লড়াইয়ে ফেভারিটদের দাপট যেমন সত্য, তেমনই কোনো পুঁচকে বা অখ্যাত দলের কাছে পরাশক্তিদের আচমকা হেরে যাওয়ার গল্পগুলোই বিশ্বকাপকে করে তোলে রূপকথার মতো অনন্য। ২০২৬ বিশ্বকাপের দামামা যখন বাজছে, তখন এক নজরে দেখে নেওয়া যাক ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ১০টি অঘটন, যা স্তব্ধ করে দিয়েছিল পুরো বিশ্বকে।

১. ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা অঘটন এটি। তৎকালীন ইংল্যান্ড দলে ছিলেন আলফ রামসে, টম ফিনির মতো কিংবদন্তিরা। অন্যদিকে মার্কিন দলটি গড়া হয়েছিল ডাকপিয়ন, ধোবা আর শিক্ষকের মতো খণ্ডকালীন অপেশাদার খেলোয়াড়দের নিয়ে, যারা একসঙ্গে মাত্র একদিন অনুশীলন করার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু ম্যাচের ৩৮ মিনিটে জো গ্যাটজেন্সের করা একমাত্র গোল এবং গোলরক্ষক ফ্রাঙ্ক বোরগির অতিমানবীয় রক্ষণে স্তব্ধ হয়ে যায় ইংল্যান্ড।

২. পশ্চিম জার্মানি ৩–২ হাঙ্গেরি (১৯৫৪)
পঞ্চাশের দশকের হাঙ্গেরিকে বলা হতো ‘মাইটি ম্যাগিয়ার্স’, যার নেতৃত্বে ছিলেন সর্বকালের অন্যতম সেরা ফরওয়ার্ড পুসকাস। টুর্নামেন্টের আগের ম্যাচেই জার্মানিকে ৮-৩ ব্যবধানে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল হাঙ্গেরি। ফাইনালেও প্রথমার্ধেই ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় তারা। কিন্তু এরপরই শুরু হয় জার্মানির অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন। ৮৪ মিনিটে হেলমুট রানের জয়সূচক গোলে ৩-২ ব্যবধানে ম্যাচ জিতে চ্যাম্পিয়ন হয় জার্মানি। ফুটবল ইতিহাসে এই ম্যাচটি ‘দ্য মিরাকল অব বার্ন’ নামে পরিচিত।

৩. উত্তর কোরিয়া ১–০ ইতালি (১৯৬৬)
রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে উত্তর কোরিয়ার খেলোয়াড়দের ইংল্যান্ডে আসাই প্রায় অনিশ্চিত ছিল। সেই অনামী দলটির মুখোমুখি হয়েছিল দুই বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালি। ম্যাচের মাঝপথে ইতালির মিডফিল্ডার বুলগারেত্তো চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন (তখন খেলোয়াড় বদলির নিয়ম ছিল না)। ১০ জনের ইতালির রক্ষণ ভেঙে ম্যাচের ৪২ মিনিটে গোল করেন উত্তর কোরিয়ার পাক দু ইক। এই এক গোলেই টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যায় ইতালি।

৪. আলজেরিয়া ২–১ পশ্চিম জার্মানি (১৯৮২)
তৎকালীন ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন পশ্চিম জার্মানি দলে ছিলেন রুমেনিগে আর মাথেউসের মতো তারকারা। আলজেরিয়াকে পাত্তাই দিতে চায়নি তারা। কিন্তু ম্যাচের ৫৪ মিনিটে রাবাহ মাদজেরের গোলে লিড নেয় আলজেরিয়া। রুমেনিগে জার্মানিকে সমতায় ফেরালেও তার পরের মিনিটেই লখদার বেলৌমির করা দুর্দান্ত গোল আলজেরিয়াকে এনে দেয় রূপকথার এক জয়।

৫. ক্যামেরুন ১–০ আর্জেন্টিনা (১৯৯০)
বর্তমান চ্যাম্পিয়ন, হট ফেভারিট এবং ডিয়েগো ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা। উদ্বোধনী ম্যাচে মিলানের সান সিরো স্টেডিয়ামে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল বিশ্বকাপের নবাগত দল ক্যামেরুন। ম্যারাডোনাদের একের পর এক আক্রমণ রুখে দিয়ে দ্বিতীয়ার্ধে ফ্রাঁসোয়া ওমাম-বিয়িকের এক বুলেট হেডারে লিড নেয় ক্যামেরুন। শেষ পর্যন্ত সেই লিড ধরে রেখে বিশ্বকে চমকে দেয় আফ্রিকার অদম্য সিংহরা

৬. ফ্রান্স ০–১ সেনেগাল (২০০২)
২০০২ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচটি ছিল নানা উপাখ্যানে ভরা—সাবেক উপনিবেশ বনাম উপনিবেশ স্থাপনকারী এবং বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন বনাম নবাগত দল। থিয়েরি অঁরি, ডেভিড ত্রেজেগেদের বিশ্বসেরা আক্রমণভাগকে বোতলবন্দি করে ফেলে সেনেগাল। ৩০ মিনিটে পাপা বুবা দিওপের ঐতিহাসিক গোলে জয় পায় আফ্রিকার দেশটি। ফ্রান্স সেবার গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়।

৭. জার্মানি ৭–১ ব্রাজিল (২০১৪)
এটি কেবল অঘটন নয়, ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ‘ন্যাশনাল হিউমিলিয়েশন’ বা জাতীয় লজ্জা। ঘরের মাঠে হেক্সা মিশনের সামনে থাকা ব্রাজিল সেমিফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল জার্মানির। নেইমার ও থিয়াগো সিলভাহীন ব্রাজিল ম্যাচের প্রথম ২৯ মিনিটেই ৫ গোল খেয়ে বসে! শেষ পর্যন্ত ঘরের মাঠে ১-৭ গোলের এই ঐতিহাসিক পরাজয় ‘মিনেইরাজোর ট্র্যাজেডি’ হিসেবে ফুটবল ইতিহাসে দাগ কেটে আছে।

৮. নেদারল্যান্ডস ৫–১ স্পেন (২০১৪)
২০১০ বিশ্বকাপের দুই ফাইনালিস্ট যখন ২০১৪-এর গ্রুপ পর্বে মুখোমুখি হলো, কেউ ভাবেনি এমন কিছু ঘটবে। জাভি-ইনিয়েস্তাদের স্পেন জাবি আলোনসোর পেনাল্টিতে এগিয়েও গিয়েছিল। কিন্তু প্রথমার্ধের ঠিক আগে রবিন ফন পার্সির সেই বিখ্যাত ‘ফ্লাইং ডাচম্যান’ হেডার ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। দ্বিতীয়ার্ধে স্প্যানিশ ডিফেন্সকে ছিন্নভিন্ন করে আরও ৪টি গোল দেয় ডাচরা। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে কোনো দলের এটিই সবচেয়ে বড় ব্যবধানে হার।

৯. দক্ষিণ কোরিয়া ২–০ জার্মানি (২০১৮)
বর্তমান চ্যাম্পিয়ন জার্মানির নকআউট পর্বে যেতে শেষ ম্যাচে দরকার ছিল একটি জয়। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার বিদায় প্রায় নিশ্চিত ছিল। ম্যাচের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জার্মানি মরিয়া হয়ে আক্রমণ করলেও ইনজুরি টাইমের দ্বিতীয় মিনিটে কিম ইয়ং-গুন গোল করে কোরিয়াকে এগিয়ে নেন। সমতা ফেরাতে জার্মানির গোলরক্ষক ম্যানুয়েল নয়্যার গোলপোস্ট ছেড়ে কোরিয়ার বক্সে চলে গেলে কাউন্টার অ্যাটাকে ফাঁকা পোস্টে দ্বিতীয় গোলটি করেন সন হিয়ুং-মিন। ১৯৩৮ সালের পর প্রথমবার গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেয় জার্মানি।

১০. সৌদি আরব ২–১ আর্জেন্টিনা (২০২২)
কাতার বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় এবং রোমাঞ্চকর অঘটন। লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা টানা ৩৬ ম্যাচ অপরাজিত থেকে টুর্নামেন্ট শুরু করেছিল। ম্যাচের ১০ মিনিটে মেসির পেনাল্টিতে লিডও নেয় আলবিসেলেস্তেরা। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই দৃশ্যপট বদলে যায়। ৪৮ মিনিটে সালেহ আল-শেহরি এবং ৫৩ মিনিটে সালেম আল-দাওসারির চোখ ধাঁধানো বাঁকানো শটে লিড নেয় সৌদি আরব। আর্জেন্টিনার একের পর এক আক্রমণ রুখে দিয়ে ঐতিহাসিক জয় তুলে নেয় তারা। যদিও আর্জেন্টিনা পরবর্তীতে ঘুরে দাঁড়িয়ে সেবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল, তবে লুসাইল স্টেডিয়ামের সেই রাতটি ফুটবল বিশ্ব কোনোদিন ভুলবে না।

ফুটবল রোমান্টিকদের আশা, এবারের ২০২৬ বিশ্বকাপেও এমন কিছু ম্যাচ উপহার মিলবে, যা ফুটবল ইতিহাসের পাতায় নতুন করে ‘অঘটন’ শব্দের সংজ্ঞা লিখবে।

সূত্র: আল জাজিরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back To Top