ভোরের আলো ফোটার আগেই পোর্ট অব প্রিন্সের মাটি কেঁপে উঠেছিল প্রলয়ংকরী এক ভূকম্পনে। ২০১০ সালের সেই ভয়াল ১২ জানুয়ারি দুই লাখের বেশি মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়া মহাবিপর্যয় গুঁড়িয়ে দিয়েছিল হাইতির রাজধানী। ধ্বংসস্তূপ আর স্বজন হারানোর কান্নার সেই মিছিলে তখন জীবনমৃত্যুর ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়েছিল মাত্র আট-নয় মাসের এক শিশু—স্টেফান রামোস। ঠিক তার আগের দিনই যে শিশুটিকে আইনি প্রক্রিয়ায় দত্তক নেওয়ার কাজ শুরু করেছিল এক দূরদেশি আর্জেন্টাইন পরিবার! অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া সেই কাগজপত্র অক্ষত থাকায় রক্ষা পায় শিশুটি, আর মুহূর্তের মধ্যে তাকে পাড়ি জমাতে হয় দক্ষিণ আমেরিকার নতুন এক ঠিকানায়।
আজ সেই অবুঝ কুঁড়েঘর থেকে উঠে আসা শিশুটি আর শুধু হাইতির স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ নেই; সে এখন আর্জেন্টিনার আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠা এক দামাল তরুণ—কিকি রামোস। আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে লিওনেল মেসি কিংবা হুলিয়ান আলভারেজদের দেশের হয়ে কোনো কৃষ্ণাঙ্গ ফুটবলারের মাঠ মাতানোর দৃশ্যটি যেমন অভিনব, তেমনি এই পথচলার গল্পটি সিনেমার চেয়েও নাটকীয়। নিয়তির খেলায় আর্জেন্টিনার ভেলেজ সার্ফিল্ড ক্লাবের নিচের সারিতে মাত্র ছয় বছর বয়সে যার ফুটবল হাতেখড়ি হয়েছিল, আজ সে সিঁড়ি বেয়ে পৌঁছে গেছে জাতীয় দলের আঙিনায়।
জুলাইয়ের শেষে ইকুয়েডরের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে আকাশি-নীল জার্সিতে অভিষেক ঘটে কিকির। আতালান্তার লেওন কোলবোভস্কি স্টেডিয়ামে দ্বিতীয় ম্যাচে প্রথমার্ধে পিছিয়ে পড়া আর্জেন্টিনাকে সমতায় ফেরানো সেই একমাত্র গোলটি এসেছিল এই তরুণেরই জাদুকরি পা থেকে। গতি আর ড্রিবলিংয়ের দারুণ দক্ষতায় দিয়েগো প্লাসেন্তের অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপের পরিকল্পনায় নিজের নামটা তাই দারুণভাবেই খোদাই করে নিয়েছেন তিনি। গোল করার পরদিন সংবাদমাধ্যমের সামনে অবশ্য এক অপ্রীতিকর প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাকে—আর্জেন্টিনা কি তবে বর্ণবাদী দেশ? কিন্তু এক ফোঁটা দ্বিধাও ছিল না কিকির কণ্ঠে, অকপট আত্মবিশ্বাসে তিনি উড়িয়ে দিয়েছেন সব অপবাদ, ‘যেদিন থেকে আমি আর্জেন্টিনায় আছি, কখনো নিজেকে বৈষম্যের শিকার মনে হয়নি। যারা আর্জেন্টিনাকে বর্ণবাদী বলে, তারা শুধু বলার জন্যই বলে।’
বন্ধুদের বার্তা আর ফিটনেস কোচের মেসেজে এএফএ শব্দটা দেখে প্রথমে ভুল পড়া সেই তরুণটি আজ হাইতিতে জন্ম নেওয়া আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে চাপানো প্রথম ফুটবলার। যার ভাষা, রাস্তা আর ফুটবল মাঠের প্রতিটি কণা জুড়ে আজ শুধুই আর্জেন্টিনা। আসছে নভেম্বর-ডিসেম্বরে কাতারে অনুষ্ঠেইয় অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপে ৪৮ দলের নতুন ফরম্যাটে ডেনমার্ক, মোজাম্বিক আর অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে গ্রুপ সি-তে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে আর্জেন্টিনা। আর সেই মহা মঞ্চে নীল-সাদা জার্সির নতুন ইতিহাস লেখার অপেক্ষায় আছেন হাইতির সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরা ছোট্ট কিকি রামোস।
